:

গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষায় বাংলাদেশ

top-news

দীর্ঘ ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, বাংলাদেশ এখন সেই যাত্রার চূড়ান্ত প্রান্তে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব।

ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে এই প্রথম ১২ কোটি ৭০ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন। বিশ্ব গণমাধ্যমের চোখে এটি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ভোট নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের এক অনন্য পরীক্ষা।

এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট গত কয়েক দশকের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন ক্ষমতার প্রধান দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দলটির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্দীপনা হয়ে এসেছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১৭ বছর পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।

গত ২৫ ডিসেম্বর তার বীরোচিত ঢাকা প্রত্যাবর্তন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। তবে নির্বাচনের মাত্র দেড় মাস আগে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপি শিবিরে এক শোকাতুর আবহ তৈরি করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি জনমতে দলটির প্রতি এক বিশাল সহানুভূতির ঢেউ সৃষ্টি করেছে। বিএনপি এখন একদিকে শোক আর অন্যদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে জয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে নির্বাচনী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

অন্যদিকে, এবারের নির্বাচনে বিস্ময়কর শক্তি হিসেবে দেখা দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।  বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী দলটি  ২০২৪-এর আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পর নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। তারা  নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণ ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছে।

বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দ্বারা গঠিত 'জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)'-র সাথে জামায়াতের নির্বাচনী জোট বাংলাদেশের  রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে।  এই জোটের সাথে বিভিন্ন আর্ন্তজার্তিক সংস্থার যোগােযোগ থাকা এবং বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানের আশংকা তৈরী হয়েছে।

নির্বাচনের পাশাপাশি দেশজুড়ে আলোচনা চলছে ‘জুলাই চার্টার’ নিয়ে। এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা সনদ, যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য বাধ্য করবে। ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট পেপারে এই চার্টারের ওপর একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।

তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, আওয়ামী লীগের মতো বড় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখা এবং দলটির শীর্ষ নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ছায়া হয়ে দাঁড়াতে পারে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

বিশেষ করে নভেম্বর ২০২৫-এ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ইন-অ্যাবসেন্টিয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

এদিকে,নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ৯ লাখ নিরাপত্তা সদস্যের মধ্যে ১ লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। তবে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যার মতো ঘটনাগুলো দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ভাবিয়ে তুলছে।

ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের দ্বৈরথ নতুন সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা এবং অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করা হবে নতুন প্রশাসনের জন্য প্রথম দিনের পরীক্ষা।

১২ ফেব্রুয়ারির সূর্যালোক বাংলাদেশের জন্য এক নতুন ভোরের বার্তা নিয়ে আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আর সম্ভাবনা দুটোই রয়েছে।

 এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কি একটি দীর্ঘমেয়াদী গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে, না কি নতুন কোনো অস্থিতিশীলতার আবর্তে পড়বে। বিশ্বের চোখ এখন ঢাকার রাজপথে, যেখানে ভাগ্য নির্ধারিত হতে যাচ্ছে কোটি কোটি মানুষের।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ককে এক সময় 'সোনালী অধ্যায়' হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, ২০২৪ সালের আগস্টের পরিবর্তনের পর সেই সমীকরণে বড় ধরনের ফাটল ধরে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং দিল্লির সাউথ ব্লকের জন্যও এক বিশাল কৌশলগত পরীক্ষা। গত দেড় বছরে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের যে শীতলতা তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। ভারতের দীর্ঘকালীন পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রিক।

Crisis Group-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় গ্রহণ এবং সেখান থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করেছে। নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকারের জন্য  নৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি তার বক্তব্যে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা আগে বাংলাদেশ—এই স্লোগান সামনে এনেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ভারতের সঙ্গে একটি সম্মানজনক এবং বাস্তবমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, যা হাসিন আমলের ‘একপক্ষীয়’ সম্পর্কের চেয়ে ভিন্ন হবে।

Chatham House-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতও এখন বিএনপির সঙ্গে কাজ করার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত কয়েক মাসে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের গোপন ও প্রকাশ্য বৈঠকগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, দিল্লি এখন কেবল একটি দলের ওপর বাজি না ধরে সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী।

তবে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে (বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতা) কতটুকু আশ্বস্ত করতে পারবে, তা নিয়ে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এখনো দ্বিধা রয়েছে।

২০২৬ সাল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য কেবল নির্বাচনের কারণেই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। এ বছরই গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য এই চুক্তি নবায়ন করা হবে এক বিশাল পরীক্ষা। এছাড়া সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে প্রাণহানি, তিস্তা পানি বণ্টন এবং ট্রানজিট সুবিধার মতো ইস্যুগুলো নিয়ে জনগণের মধ্যে থাকা ভারত-বিরোধী মনোভাব প্রশমন করা নতুন সরকারের জন্য সহজ হবে না।

PRS India-এর এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (CEPA) স্বাক্ষরের পরিকল্পনা থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এই প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দিতে পারে।

নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভারতের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে চীনের বিনিয়োগ এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো মনে করছে, নতুন সরকার যদি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে পাশ কাটিয়ে চীন বা পাকিস্তানের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, তবে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা ও বাণিজ্য বাধার মতো নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে।

১২ ফেব্রুয়ারির পর যে সরকারই আসুক না কেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারকে তার সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে এই দুই দেশের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহযোগিতার ওপর।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন,  আস্থার সংকট ও আওয়ামী লীগ পরবর্তী বাস্তবতা গত দেড় বছরে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের যে শীতলতা তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। ভারতের দীর্ঘকালীন পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রিক।

Crisis Group-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় গ্রহণ এবং সেখান থেকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কের টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করেছে। 

এখন দেখার বিষয় নতুন সরকার কিভাবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেল করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়, দেশের অর্থনীতির ধারাকে গতিশীল করে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *